গিন্নী
মেয়ে দেখতে আসছেন পাত্রের জ্যাঠামশাই এবার।
এটা নিয়ে তিনবার হবে। প্রথমে দেখে গেছেন পাত্রের বাবা এবং মামা। বাবা মনে হল একটু সাদাসিধা ঢিলেঢালা মানুষ, নিতান্ত নাকি ছেলের বাপ তাই এসেছেন। মামা কিন্তু এক্সপার্ট মেয়ে-দেখিয়ে। সাধারণ প্রশ্ন এমনি যা সব তা তো হলই, তারপর অঙ্গাদি পরীক্ষাতেও বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। বাঁ হাতে ওর ডান হাতটি নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আঙুলগুলি পরীক্ষা করলেন, পরে বাঁ হাতের গুলিও। একটু ঘষে ঘষেই হাতের উলটো পিঠ, মণিবন্ধ পরীক্ষা করলেন, ত্বকের মসৃণতা দেখবার ছলেই অবশ্য, কিন্তু যারা বোঝবার তারা বুঝল, রঙ-পাউডার মাখানো হয়েছে কিনা তারই যাচাই। আসনপিঁড়ি হয়ে বসেছিল, পা-দুটি জড়ো করিয়ে পা দেখলেন, আঙুল দেখলেন। খোঁপা বাঁধা ছিল, ভেতরে পাঠিয়ে খুলিয়ে আনিয়ে চুল দেখলেন। হেঁটেই এসেছে, তবু বিদায় দেওয়ার সময় বললেন—“অত লজ্জা করে হাঁটছ কেন মা, যেমন চলাফেরা করো বাড়িতে, সেইভাবে যাও, লজ্জা কিসের?”
মেয়ে অবশ্য আরও জড়োসড়োই হয়ে গেল খানিকটা, তবে আর টুকলেন না। চার বার তো হল দেখা; চুল খুলিয়ে আনার মধ্যে চুলও ছিল, চালও ছিল। যারা বোঝবার তারা বুঝল, এলো চুলে এলে খোঁপা বাঁধিয়ে আনাতেন।
খলিফা লোক।
এর পর দেখে গেল পাত্র স্বয়ং এবং তার বন্ধু।
পাত্রটি বাপের মতো অতটা ঢিলেঢালা আর নির্বিরোধী হয়তো নয়, তবে জিজ্ঞাসাবাদের দিকে একেবারেই গেল না। তার কারণ এও হতে পারে যে, তার সমস্ত সময়টা নির্লিপ্তভাবে কিছু না দেখার ভান করে যতটা দেখা যায়, সেই চেষ্টাতেই গেল কেটে। তবে বন্ধুটি খুব চৌকস। পড়াশোনার কথা জিজ্ঞাসা করল, হাতের লেখা দেখল, হাতের কাজ আনিয়ে দেখল, ভেতরে পাঠিয়ে গান শুনে নিল, তারপর আবার এসে যখন বসল, বেশ একটু বিস্মিতভাবেই প্রশ্ন করল, —“আবার ফিরে এলেন যে, এবার আপনি কিছু জিজ্ঞেস করবেন?”
সে হয়তো রসিকতাটুকু পছন্দ করল, তাকেও একটু হেসে উঠতে হল, আর নিরীহ রসিকতাই তো। তবু কাকা সরে গেলেন; মুখ-আল্গা আজকালকার ছেলে, একটু যাবেই জিভ ফসকে এরকম। সামনে না আসাই ভালো। মেয়েও হেসে ফেলেছিল, কোন রকমে উঠে জড়িতপদে তাড়াতাড়ি চলে গেল। ছেলেটি হাল্কা আসরে একবার সবার দিকে চেয়ে নিয়ে হাত জোড় করে বলল—“আমায় মাফ করবেন, ছেলের ফরমাশ ছিল হাসিটুকু পর্যন্ত দেখাতে, তাই…”
পাত্র কাঁকালে চিমটি কেটে ধরায়—“উঃ, রাস্কেল!” বলে চুপ করে গেল।
এবার আসছেন জ্যাঠামশাই। আসুন, মেয়ে থাকলে দেখানর বিড়ম্বনা মাথা পেতে সহ্য করতেই হয়, কিন্তু এবার সবাই একটু বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। শোনা যাচ্ছে, অত যে খুঁটিয়ে দেখা হল দু দফা, তার নাকি কোনও মূল্য নেই, সব নির্ভর করছে জ্যাঠামশাই কি রায় দেন, তার ওপর। তিনি ছিলেন না, এসেছেন, এবার আসবেন।
মেয়ে-দেখার একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আজকালকার অভিভাবকেরা এতটা পছন্দ করেন না। কিন্তু এক্ষেত্রে একটু আলাদা ব্যাপার হয়েছে। ছেলেটি খুবই ভালো, পরীক্ষা দিয়ে এবার ডেপুটি হয়েছে। এদিকে অভিভাবকদের শুধু ভালো মেয়ে দরকার, যতটা সম্ভব সুন্দরী, তারপর যতটুকু সম্ভব শিক্ষিতা। অন্যদিকে একেবারেই লক্ষ নেই।
সেটা যে নেই, তা খুব জানা কথা বলেই কন্যার অভিভাবকেরা অগ্রসর হতে সাহসী হয়েছেন, এক শুধু মেয়ের জোরে। এমন কিছু দূরের ব্যাপার নয়, রিষড়া-শ্রীরামপুর, তাও মাইল দু’য়েকের মধ্যে দু পক্ষের বাড়ি। খোঁজ নেওয়া সহজ, পাওয়া গেছে অনেকখানি, তার মধ্যে এটা পাকাপাকি রকমই জানা গেছে যে, ঐ যে অন্য কিছুর দিকে লক্ষ নেই, সেটা শুধু মুখের কথাই নয়, সত্যই দেখে শুনে গৃহস্থের বাড়ি থেকেই মেয়ে এনেছেন ওঁরা। যাদের এমনি ওঁদের বাড়ির ছেলের নাগাল পাওয়ার কথা নয়।
সহ্য করতে হবে মেয়ে-দেখার বাড়াবাড়ি। জ্যাঠামশাইয়ের পছন্দ হলেও নিশ্চয় মেয়েদের অভিযান। উপায় কী?
কিন্তু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments